
বছর ঘুরলেও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের অস্থিরতা কাটেনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে দাম আগের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় কবে নাগাদ স্বর্ণের বাজার স্থিতিশীল হবে—তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তের পর স্বর্ণ, রুপা ও প্লাটিনামসহ মূল্যবান ধাতুর বাজারে সাময়িক দরপতন দেখা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর বাজারে অস্থিরতার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব কটি কারণই ট্রাম্পের বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত সোমবার প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করে এবং স্বল্প সময়ের জন্য ৫ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। একই সময়ে রুপা ও প্লাটিনামের দামও বেড়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। গত বৃহস্পতিবার দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ওঠে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায়, যা ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ। তবে পরের দুই দিনে দুই দফায় ভরিপ্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা কমে যায় দাম।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিললে মূল্যবান ধাতুর দাম তুলনামূলক দ্রুত কমে আসে। ট্রাম্প যেসব দেশকে বাণিজ্যিকভাবে অনুকূল মনে করেন না, তাদের পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়াল বলেন, ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, যা স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতিতে ভূমিকা রাখছে।
এমা ওয়ালের মতে, বিশ্ব পরিস্থিতি অস্থির হলে স্বর্ণ স্বভাবগতভাবেই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বাণিজ্যিক উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক বিভাজন ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনাও দামের ঊর্ধ্বগতির একটি বড় কারণ। অনেক দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বর্ণকে রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে বাড়াচ্ছে। রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ জব্দ হওয়ার ঘটনা অন্য দেশগুলোকেও সতর্ক করেছে। ফলে তুলনামূলক নিরপেক্ষ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে। ইউরোপ, চীন ও কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে সরে এসে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদে অর্থ স্থানান্তরের প্রবণতা বাড়ে।
ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও স্বর্ণের বাজারে প্রভাব ফেলছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বিশ্ব রাজনীতিকে জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে ডলারের ওপর আস্থাও কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ হামাদ হোসেন বলেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্র ও আর্থিক নীতির ঝুঁকির বিপরীতে স্বর্ণকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে এই ধাতু বিনিয়োগকারীদের আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
ডলার দুর্বল হলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়ে। কারণ তখন অন্য মুদ্রাধারীদের কাছে স্বর্ণ তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে। সম্প্রতি ডলার সূচক কমার সঙ্গেও স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতি মিলেছে। একই কারণে রুপা ও প্লাটিনামেও বিনিয়োগ বেড়েছে।
তবে এই ঊর্ধ্বগতি স্থায়ী হয়নি। ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও পরে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল হিসেবে পরিচিত কেভিন ওয়ার্শকে মনোনয়নের খবরে বাজার কিছুটা শান্ত হয়। এর পরপরই স্বর্ণ, রুপা ও প্লাটিনামের দামে হঠাৎ পতন দেখা যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দরপতন সাময়িক। চলমান যুদ্ধ, বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা, নতুন শুল্ক আরোপ এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে অনিশ্চয়তা স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা বজায় রাখবে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের আবেদন এখনো কমেনি।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের নীতি ও বক্তব্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেই নয়, বিশ্ব বাণিজ্য ও পণ্যের বাজারেও বড় প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দামের ওঠানামা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।