
দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে চরম সংকটে থাকা ৯টি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) মধ্যে ৬টি বন্ধ বা অবসায়নের চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে আপাতত প্রাইম ফাইন্যান্স এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিকে (বিআইএফসি) অবসায়ন না করে তাদের সূচক উন্নয়নের জন্য তিন থেকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সভার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অবসায়নের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ফাস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং ঋণের অর্থ আত্মসাতের ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশে ঠেকেছে।
গত বছরের মে মাসে ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও ৯টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এই চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শুনানি পর্যালোচনা করে বোর্ড ৩টি প্রতিষ্ঠানকে তাদের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য শেষ সুযোগ দিলেও বাকি ৬টির ভাগ্য এক প্রকার নির্ধারিত হয়ে গেছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিগত সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। বিশেষ করে আলোচিত পিকে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ফাস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই সংকট নিরসনে সম্প্রতি গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এক সংবাদ সম্মেলনে আশ্বস্ত করেছেন, রুগ্ন এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীরা আগামী ফেব্রুয়ারিতে পবিত্র রমজান শুরুর আগেই তাদের জমা রাখা মূল টাকা ফেরত পাবেন।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমানতকারীদের পাওনা মেটাতে সরকার মৌখিকভাবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ অনুমোদন দিয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে একটি শর্ত দেওয়া হয়েছে, আমানতকারীরা কেবল তাদের জমা রাখা মূল অর্থ ফেরত পাবেন এবং জমাকৃত অর্থের ওপর কোনো সুদ প্রদান করা হবে না।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ মূল্যায়নের কাজ শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। এই মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে শেয়ারহোল্ডারদের প্রাপ্য অর্থের বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তায় থাকা হাজার হাজার আমানতকারীর মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।