
হিমহিম শীতসকালে রোদের ছোঁয়া পেতে মরিয়া হয়েছেন কখনো? কুয়াশা ভেদ করে সূর্য উঁকি দিলে চেয়ার টেনে উঠোনে বা বারান্দায় বসার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই রয়েছে। সত্যিই তো, কি গ্রামে কি শহরে, রোদ পোহানোর চিরন্তন সংস্কৃতি আমাদের রক্তে মিশে আছে। তবে ভাববেন না, শুধু বাংলাতেই রোদ পোহানোর ইতিহাস লেখা হয়েছে; বরং বিশ্বের বহু উন্নত দেশেও শীতসকালে রোদের উষ্ণতা খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠেন বহু মানুষ।
শীতের রোদে বসলেই মনে পড়ে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই কবিতা, ‘হে সূর্য! শীতের সূর্য!/ হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়/ আমরা থাকি,…/ সকালের এক-টুকরো রোদ্দুর/ এক টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামি।/ ঘর ছেড়ে আমরা এদিক ওদিকে যাই/ এক-টুকরো রোদ্দুরের তৃষ্ণায়…। ছেলেবেলায় পড়া সুনির্মল বসুর ‘শীতের সকাল’ কবিতাটিও বড্ড স্মৃতিকাতর করে দেয়, ‘…জড়সড় দেহ মোর, বড় শীত ভাই,/ রোদ-ছাওয়া দাওয়াটায় বসি এসে তাই;…।’
শীতের রোদ অনেকের কাছে সোনার চেয়েও দামি। যা গ্রীষ্মের মতো দগ্ধ যেমন করে না, তেমনি বর্ষার মতো অনুপস্থিতও নয়। শীতার্ত মানুষকে ডাকে নীরব হাতছানিতে। কুয়াশা কেটে গেলে গ্রামের উঠোনে, শহরের বারান্দায়, অফিসের ছাদে কিংবা চায়ের দোকানের সামনে মানুষ চেয়ারে বসে মুখ তুলে দেয় সূর্যের দিকে। শীতে এভাবে রোদ পোহানো যেন এক অঘোষিত উত্সব। লোকজ বিশ্বাস মতে, শীতের রোদ গায়ে লাগালে রোগ সেরে যায়। শুধু তা-ই নয়, শিশুকে রোদে বসালে শক্তি বাড়ে। প্রাচীনকাল থেকে রোদকে স্বাস্থ্য, শক্তি ও উষ্ণতার উত্স মনে করা হতো। আধুনিক গবেষণাতেও বলা হয়েছে, শীতের রোদ ভিটামিন ডি উত্পাদনে সহায়ক, যা হাড়, দাঁত ও রোগপ্রতিরোধক্ষমতার জন্য অপরিহার্য। তাছাড়া রোদ মস্তিষ্কে সেরোটোনিন বাড়ায়, মন ভালো রাখে, মৌসুমি বিষণ্নতা কমিয়ে দেয়।
ইতিহাস: শীতে রোদ পোহানো অতি মামুলি মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। প্রাগৈতিহাসিক যুগে গুহাবাসী মানুষ শীত মোকাবিলায় ভরসা করত আগুন আর সূর্যের ওপর। শীতে সূর্যের আলো কম থাকায় তারা রোদের সময়টুকুতে শিকার আর শরীর গরম করত। সেই থেকে রোদ পোহানোর অভ্যাস শুরু। প্রাচীন মিশরে সূর্যদেব ‘রা’ ছিলেন জীবন ও আরোগ্যের প্রতীক। শীতকালে রোগীদের বসানো হতো রোদে। প্রাচীন গ্রিসে প্রথম হেলিওথেরাপি বা সূর্যচিকিত্সার ধারণার উদ্ভব ঘটে। গ্রিক চিকিত্সক হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন, সূর্যের আলো রোগ সারাতে পারে। শীতকালে শরীর উষ্ণ রাখতে রোদে বসা ছিল চিকিত্সার অংশ।
রোমান সভ্যতায় রোদ পোহানো ছিল সামাজিক রীতি। অভিজাতরা সোলারিয়াম নামের ঘর তৈরি করে সেখানে রোদ পোহাতেন। ভারতীয় উপমহাদেশে সূর্যদেবকে দেবতা হিসেবে পূজা করা হতো। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, শীতের রোদ দেহের দোষ কমায়। ১৯শ-২০শ শতকে ইউরোপের শীতপ্রধান দেশে শিশুদের হাড় দুর্বল হয়ে যেত। পরে গবেষণায় প্রমাণিত হয়, সূর্যের আলোতে ভিটামিন ডি রয়েছে। সেই থেকেই শীতে রোদ পোহানো একটা চিকিত্সা। মনোবিজ্ঞানের মতে, শীতের রোদ মন ভালো করে, বিষণ্নতা কমায় আর ঘুমের ছন্দ ঠিক রাখে। বাংলার সামাজিক ইতিহাসে শীতে রোদ পোহানো জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
শীতরোদে রাজনীতি : শীতের রোদ নীরব ও নরম হলেও রাজনীতি ও সমাজে তার উপস্থিতি উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের উপস্থিতি, সভা, আইন প্রণয়ন—সবই রোদের আলোকিত ছায়ায় স্থির হতো। আধুনিক যুগেও শহুরে সভা বা প্রশাসনিক কার্যক্রমে আলো ও রোদকে বিবেচনা করা হয়। রোমান সাম্রাজ্যে সিনেট ও জনসভায় শীতকালে রোদ কম পড়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় দুপুরে নির্ধারণ করা হতো। এতে সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত হতো, আইন প্রণয়নও সহজ হতো। মধ্যযুগীয় ইউরোপের শহরে আদালত ও গণমঞ্চের জানালা ও দরজা শীতের রোদ অনুযায়ী তৈরি হতো। যাতে নাগরিকরা সঠিক সময় উপস্থিত থাকতে পারে।
১৯১৬ সালে ব্রিটেনে প্রথম ডে-লাইট সেভিং টাইম চালু হয়। শীতের সীমিত আলোকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিকদের উত্পাদন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। এই আইন প্রমাণ করে, আলো ও রোদকে রাজনীতি বা প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে শীতকালে রাজনৈতিক সভা বা সমাবেশ রোদে বসার সময় নির্ধারণের মাধ্যমে পরিকল্পিত হতো। শীতের রোদ জনসাধারণের উপস্থিতি ও রাজনৈতিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতো অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে। ফলে রাজনৈতিক ইতিহাসে শীতের রোদ শুধু উষ্ণতা নয়; বরং প্রশাসনিক কার্যক্রমেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
দেশে দেশে রোদ পোহানো : দক্ষিণ এশিয়ার দেশ প্রধানত বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে শীতকালে রোদ সহজলভ্য। তাই উঠোনে শিশু-বৃদ্ধদের রোদে বসিয়ে দেওয়া হয়। চা আড্ডাও জমে উঠে। শীতপ্রধান উত্তর চীনে পার্ক বা খোলা জায়গায় রোদ পোহানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। যা রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য সংস্কৃতির অংশ। জাপানে বাসাবাড়িতে সূর্যের আলো ঢোকার ব্যবস্থা রাখা হয়। বারান্দায় বসে রোদের ছোঁয়া নেওয়া হয়। শীতপ্রধান স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে সূর্যালোক স্বল্প। রোদের জন্য বড় জানালা, সানরুম রাখা হয়। যতক্ষণ সূর্য দেখা যায় ততক্ষণ বাইরে বসে উপভোগ করা হয়।
রোদে জীবনশক্তি: সকাল ও বিকালের রোদে থাকা ইউভিবি রশ্মি ত্বকে পড়লে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। শিশুদের হাড় ও দাঁতের সঠিক গঠন, চোখের সুস্থতা, রোগপ্রতিরোধক্ষমতা, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর বিকাশে ভিটামিন ডি জরুরি। তবে আধুনিক শহুরে ফ্ল্যাট সংস্কৃতির কারণে ঘরবন্দি শৈশব কাটানো শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে রোদ থেকে। তারা বড় হচ্ছে স্ক্রিন-নির্ভর কৃত্রিম আলোয়। ফলে ভিটামিন ডি’র ঘাটতির কারণে শুধু হাড় নয়, চোখের সমস্যায় চশমা পরতে হচ্ছে প্রায় প্রতিটি শিশুকে। হাড় নরম হয়ে রিকেটস রোগ হচ্ছে। দাঁত উঠছে দেরিতে। ঘন ঘন সর্দি-কাশি লেগেই থাকছে। ইনফেকশন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। ভিটামিন ডি ঘাটতির কারণে মনোযোগের ঘাটতি, অস্থিরতা আর বিষণ্নতা বাড়ছে।
শীতের রোদে নস্টালজিয়া: শীতের রোদ কেবল উষ্ণতা নয়, শিল্প সাহিত্যে স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও আবেগেরও প্রতীক। বাংলা সাহিত্যে গ্রামীণ জীবনের শীতকালীন দৃশ্য রঙিন করতে রোদকে ব্যবহার করেছেন বহু কবি-সাহিত্যিক। গ্রামের উঠোনে রোদে বসা মানুষ, শিশুদের খেলা, দাদু-নানির গল্প—সবই স্মৃতি উসকে দিয়ে যায়। শীতের রোদ নীরব সঙ্গী হয়ে মানুষের মন ও প্রকৃতির আন্তঃসংযোগ ঘটায়। পশ্চিমা সাহিত্য ও চিত্রকর্মেও শীতের রোদকে নস্টালজিয়া, আনন্দ বা মায়ার প্রতীক হিসেবে দেখা যায়।
নগরবিদদের পাঁচ পরামর্শ: আধুনিক শহরে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে রোদ পোহানোকে শহুরে পরিকল্পনার অংশ করে তোলা জরুরি। নগর বিশেষজ্ঞ বা নগরবিদরা সেজন্য পাঁচটি পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, পার্ক, খোলা মাঠ ও কমিউনিটি স্কয়ার এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে, যেখানে রোদে বসা, হাঁটা বা খেলাধুলা করা সহজ হয়। স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে আউটডোর ক্লাসরুম বা ছাদের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাড়ির জানালা ও বারান্দা দক্ষিণমুখী হলে শীতের রোদ সহজে ভেতরে ঢোকে। সানরুম বা শীতকালীন ছাদ শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য নিরাপদ রোদ পোহানোর স্থান হতে পারে। তৃতীয়ত, রাস্তা, চত্বর ও গাছ পথে রোদে বসার বেঞ্চ রাখা। শীতকালীন উদ্যান ও খোলা গার্ডেনে বেঞ্চ রাখার মাধ্যমে সবাই সহজে রোদ পোহাতে পারে। চতুর্থত, শহরের বাতাস পরিষ্কার রাখার জন্য বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি করতে হবে। রোদকে আটকানো উচ্চ বিল্ডিং বা কংক্রিটের চাপে সমাধান খুঁজতে হবে। সর্বশেষ স্কুলে ‘সকালের রোদ পিরিয়ড’ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পার্ক বা কমিউনিটি সেন্টারে পরিবারের জন্য রোদভিত্তিক ইভেন্ট আয়োজন করা যেতে পারে। নগরবিদরা বলছেন, শীতে রোদ পোহানো শুধু স্বাস্থ্য নয়, বরং শহরের জীবনশৈলী ও সামাজিক সংস্কৃতির অংশ।