
রাতের সিলেট তখন ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে। ফ্লাডলাইটের আলো যেন হালকা ঝাপসা হয়ে মিশে যাচ্ছে শীতল বাতাসে। তবে মাঠে, ডাগআউটে, গ্যালারিতে তখন আলোর কেন্দ্রে একজনই, রিপন মন্ডল। গত বৃহস্পতিবার রংপুর রাইডার্সের বিরুদ্ধে শেষ ওভারের জাদুতে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সকে অবিশ্বাস্য এক ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছেন এই তরুণ পেসার। তার পর সুপার ওভারে নিজের ধৈর্য, নিখুঁত ইয়র্কার আর চাপ সামলানোর অদ্ভুত দক্ষতায় জিতিয়েছেন দলকে।
সুপার ওভারে রিপনেই আস্থা রেখেছেন রাজশাহী অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। বিশ্বাস রেখেছেন কোচ হান্নান সরকারও। রিপন সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছেন। এক উইকেট নিয়ে পুরো ওভারে দিয়েছেন মোটে ৬ রান। তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাটে তিন বলেই সেই ৬ রান তাড়া করে জয় তুলে নেয় রাজশাহী। ম্যাচ সেরার পুরস্কার উঠেছে রিপনের হাতেই।

অবশ্য রিপনকে নিয়ে আলোচনার শুরুটা বিপিএল নয়, হয়েছে রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপ থেকে। কাতারের দোহায় সেই টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১১ উইকেট নিয়ে শীর্ষ উইকেটশিকারী ছিলেন তিনি। সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে তার দুই ইয়র্কারে জেতানো ম্যাচ এখনো আলোচনায়। ফাইনালে পাকিস্তান শাহিনসের বিপক্ষে হেরে যাওয়া ম্যাচটিও তার ব্যাটিংয়েই সুপার ওভারে গিয়েছিল। অথচ টুর্নামেন্টের শুরুতে রাজশাহীর একাদশে জায়গা পাননি রিপন। কিন্তু ফিরে এসেই বদলে দিলেন পুরো গল্প।
প্রথম ম্যাচেই ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা। দ্বিতীয় ম্যাচে আবার সুপার ওভারে নায়ক। এমন পারফরম্যান্সের পর তার প্রতি কোচ হান্নানের বিশ্বাসও যেন আরও গভীর, ‘এই ধরনের চাপের মধ্যে বোলারদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। রিপন যেহেতু এই অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে, আমরা আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে, রিপন পারবে।’ পুরস্কার বিতরণীতে রিপন বলেন, ”আমি শুরুতেই শান্ত ভাই আর মুশফিক ভাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই। তারা বিশ্বাস দিয়েছে, বলেছে, ‘তুমি তোমার প্ল্যানে বল করলে কেউ তোমাকে মারতে পারবে না।” হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের কোচ কোরি কলিমোর ও তারেক আজিজের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।

রিপনের এই ধারাবাহিকতা শুধু রাজশাহী নয়, এখন আলোচনায় পুরো দেশের ক্রিকেট। তার এমন পারফরম্যান্সের পর অনেকের মুখেই এক প্রশ্ন, বিশ্বকাপ দলে কি জায়গা হবে রিপনের? এ ব্যাপারে হান্নান সরকার বলেন, ‘রিপন দারুণ ছন্দে আছে। বোলাররা যখন এমন পারফর্ম করে, তাদের নিয়ে বড় ইভেন্টের চিন্তা হয়। তবে কাকে বাদ দিয়ে নেওয়া হবে, সেটাও ভাবতে হবে। এটাকে মধুর সমস্যা বলতে পারেন।’
রংপুর রাইডার্সের সহকারী ও জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলও রিপনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তার ভাষায়, ‘রাজশাহী টিমটা দারুণ খেলেছে। কিন্তু বিশেষ করে রিপন মন্ডলের প্রশংসা করতেই হবে। সে ‘এ’ দলের হয়েও চমৎকার বল করেছে, এখন সেই ছন্দই ধরে রেখেছে।’ তার মতে, নির্বাচকরা অবশ্যই রিপনের পারফরম্যান্স দেখছেন।
এ দিকে রাজশাহী দলের পক্ষ থেকেও রিপনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে বাস্তব পুরস্কারে। দল ঘোষণা করেছে, রংপুরের বিপক্ষে জয়ের পর রিপন মন্ডলকে দেওয়া হচ্ছে ১ লাখ টাকার বিশেষ বোনাস। তার সঙ্গে এস এম মেহরব হাসান ও শাহিবজাদা ফারহান পাচ্ছেন ৫০ হাজার টাকা করে। দলের ঐক্য ও সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে দলের অন্য সদস্য, কোচিং স্টাফ ও সাপোর্ট স্টাফদের দেওয়া হচ্ছে ১৫ হাজার টাকা করে পুরস্কার।
রিপনের বর্তমান আত্মবিশ্বাস ও ফিটনেসের পেছনে লুকিয়ে আছে কঠোর পরিশ্রম। গত বছর চোটের পর হাই পারফরম্যান্স স্কোয়াডে নিয়মিত ফিটনেস সেশনে ছিলেন তিনি। কোচদের মতে, সেটিই এখন ফল দিচ্ছে। হান্নান বলেন, ‘এক বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে সে আমার অধীনে ছিল। তখনই বোঝা গিয়েছিল সে অন্যরকম কিছু করতে পারবে। এখন ওর বলের গতি বেড়েছে, আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।’