
খেলোয়াড়দের মাঠের আচরণ থেকে শুরু করে ইনজুরি ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত ফুটবলের বেশ কিছু নিয়মে যুগান্তকারী পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে ফিফা। যদি এসব নিয়ম চূড়ান্ত অনুমোদন পায়, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপেই ফুটবলের গতি আর দর্শন পালটে যেতে পারে। সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবটি এসেছে খেলোয়াড়দের ইনজুরি ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, মাঠে কোনো খেলোয়াড় আহত হলে চিকিৎসা নিতে বাইরে যান। চিকিৎসা শেষেই রেফারির অনুমতিতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খেলায় ফিরে আসেন। কিন্তু এই স্বল্প বিরতিটিই অনেক সময় ম্যাচের সময়ক্ষেপণের সবচেয়ে কৌশলী অস্ত্র হয়ে ওঠে। এই সমস্যার সমাধানেই নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ফিফা।
নিয়মটি কার্যকর হলে মাঠে চিকিৎসা নেওয়া কোনো খেলোয়াড়কে খেলা শুরুর পর কমপক্ষে দুই মিনিট মাঠের বাইরে থাকতে হবে। অর্থাৎ, তার দল সেই সময় একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে খেলবে। উদ্দেশ্য একটাই, ইচ্ছাকৃতভাবে খেলার গতি বদলানোর প্রবণতা বন্ধ করা এবং ম্যাচে প্রকৃত খেলার সময় বাড়ানো।
তবে এই নিয়মে কিছু ব্যতিক্রমও থাকবে। যদি কোনো খেলোয়াড় ফাউলের কারণে আহত হন এবং রেফারি সেই ফাউলের জন্য হলুদ বা লাল কার্ড দেখান, তাহলে ঐ খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে থাকতে হবে না। গোলরক্ষকের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ফিফার মতে, এভাবে ব্যতিক্রম রাখলে ন্যায্যতা বজায় থাকবে। সঙ্গে নিয়মেরও অপব্যবহার বন্ধ হবে।
নতুন এই নিয়মের প্রথম পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়েছে গত ১ থেকে ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ফিফা আরব কাপ টুর্নামেন্টে, কাতারে। নিয়মটি খেলায় সময়ক্ষেপণ কমাতে কতটা কার্যকর হয় তার তত্ত্বাবধানে ছিলেন রেফারিজ কমিটির চেয়ারম্যান পিয়েরলুইজি কোলিনা। সেই আসরের চ্যাম্পিয়ন মরক্কো, রানার্সআপ জর্ডান। তবে মূল আলোচনায় ছিল ফিফার এই পরীক্ষার ফলাফল। ম্যাচগুলোতে দেখা গেছে, খেলোয়াড়রা চিকিৎসার অজুহাতে আর সহজে সময় নষ্ট করতে পারেননি। ফলে খেলার ছন্দ, প্রবাহ এবং তাল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
টুর্নামেন্ট শেষে আরব কাপের সব পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করেছে ফিফা। চলতি বছরের শুরুর দিকে ফুটবলের আইন অনুমোদনের একমাত্র কর্তৃপক্ষ ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডে এই বিশ্লেষণ প্রতিবেদন পাঠানো হবে। নিয়মটি বিশ্বকাপে কার্যকর হবে কিনা সেই বিষয়ে তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
ফিফার এই উদ্যোগ কেবল ইনজুরি নিয়মেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আরও কিছু প্রস্তাব এসেছে, বিশেষ করে অফসাইড নিয়মের নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে। নতুন অফসাইড নিয়মে, খেলোয়াড়ের শরীরের যে অংশ দিয়ে গোল করা সম্ভব, কেবল সেই অংশই অফসাইড নির্ধারণে বিবেচিত হবে। ফলে ‘মিলিমিটার সিদ্ধান্তে’ গোল বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা কমবে। সঙ্গে আক্রমণাত্মক ফুটবল আরও প্রাণবন্ত হবে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আগেও বলেছিলেন, ‘ফুটবলকে আধুনিক রাখতে হলে সাহসী হতে হবে, নতুন ভাবনা নিতে হবে।’
শতাব্দী ধরে যে খেলাটি কোটি হৃদয়ের ভালোবাসা, সেখানে ছোট পরিবর্তনও অনেক সমীকরণ বদলে দেয়। নতুন এই নিয়ম দুটি ফুটবলের গতি আর দর্শন কতটা বদলে দেবে তা জানতে বেশি সময় লাগবে না। মাত্র ছয় মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে বিশ্বকাপ শুরু হবে। যদি আইএফএবি সবুজ সংকেত দেয়, তাহলে এই আসরই হবে ফিফার নতুন পরীক্ষাগার।