
জেসমিন আক্তার (ছদ্মনাম) ২২ বছর বয়সে প্রথম গর্ভধারণ করেন। গর্ভকালীন চার বার চিকিত্সকের কাছে গেলে তিনি জানান, আপনার সব কিছু ঠিক আছে, বাচ্চা স্বাভাবিক প্রসব হবে। কিন্তু হাসপাতালে নিলে চিকিত্সক জানান, আপনার বয়স কম, পেটে বাচ্চা বড় হয়ে গেছে, তাছাড়া স্বাভাবিক প্রসবের জন্যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে বাচ্চার অবস্থা খারাপ হতে পারে। এসব কথা বলার পর জেসমিন আক্তারের অভিভাবকরা সম্মতি দেন সি-সেকশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দানের। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে জেসমিনের সিজার এবং তিন দিন থাকাসহ মোট ব্যয় হয় ৭৭ হাজার টাকা। এরপর দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার সময় চিকিত্সক বলেন, প্রথম বার সিজার হওয়ার কারণে এখন আর স্বাভাবিক প্রসব হবে না। অস্ত্রোপচার লাগবে।
জেসমিন আক্তারের মতো এমন অসংখ্য ঘটনা আছে অপ্রয়োজনীয় সিজারের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্মদান। এর কারণ হিসেবে জানা যায়—আন্তরিকতার অভাব এবং সরকারি নজরদারির ঘাটতির কথা। বিগত ২০২৫ সালে দেশে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে জন্ম হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ শিশুর। এই অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে বছরে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর (২০২৫ সালে) দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। তারা বলেন, বৈশ্বিকভাবে পাঁচটি শিশুর জন্মের মধ্যে একটির জন্ম হচ্ছে অস্ত্রোপচারে (প্রায় ২১ শতাংশ)। বাংলাদেশে এই হার অনেক বেশি। এখানে প্রতি দুইটি শিশুর জন্মের মধ্যে প্রায় একটি শিশুর জন্ম হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে (প্রায় ৪৫-৫২ শতাংশ)। বেসরকারি হাসপাতালগুলো এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সেখানে প্রতি ১০টি শিশুর জন্মের মধ্যে প্রায় ৮-৯টিই হচ্ছে অস্ত্রোপচারে (৮৫-৯০ শতাংশ)।
‘অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমানো’ বিষয়ক এক গবেষণায় দেখা গেছে—২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবের হার ছিল ৬২ থেকে ৭২ শতাংশ। এরপর সেখানে প্রসব-পূর্ব কাউন্সেলিং, লেবার মনিটরিং, কনসালট্যান্ট অডিট এবং আগের সিজারিয়ানের পর স্বাভাবিক প্রসব (ভিএবিসি) পদ্ধতি চালু করা হয়। এর ফলে হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচারে সন্তান প্রসবের হার ৪২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের চিকিত্সক অধ্যাপক আনজুমান আরা বলেন, ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বছরে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের কারণে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দেশের বেসরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশের বেশি পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল, জরুরি চিকিত্সাসহায়তা বা মানসম্মত লেবার রুম (প্রসবকক্ষ) নেই। ফলে আর্থিক লাভকে অগ্রাধিকার দিয়ে অস্ত্রোপচারকে সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।
আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের চিকিত্সক ও গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক খুরশীদ তালুকদার বলেন, স্বাভাবিক প্রসবে সময় লাগে। কিন্তু অধিকাংশ রোগী ও চিকিত্সক এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে চান না। তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন, স্বাভাবিক প্রসবের কারণে শিশুর মস্তিষ্কে ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু প্রসব-পূর্ব সেবা যথাযথ না হওয়ার কারণে নবজাতকের মস্তিষ্কে ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটে প্রসবের আগে। আর প্রসবকালীন সমস্যার কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি হয় ১০ শতাংশেরও কম।
স্বাভাবিক প্রসবের গুরুত্ব তুলে ধরে খুরশীদ তালুকদার বলেন, এই প্রক্রিয়া শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের শরীরের উপকারী জীবাণু বা মাইক্রোবায়োম শিশুর শরীরে স্থানান্তরের প্রধান মাধ্যম হলো স্বাভাবিক প্রসব এবং এতে জন্মের পরপরই মায়ের সঙ্গে শিশুর ‘স্কিন-টু-স্কিন’ কন্ট্যাক্ট ঘটে। অস্ত্রোপচারে জন্ম নেওয়া শিশুরা এই মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হয়।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাঈদুর রহমান বলেন, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অনেক গাফিলতি আছে। দেশে অস্ত্রোপচার অনেক বেশি শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে মায়েরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। বাস্তবতা হলো, দেশে এখন আর স্বাভাবিক প্রসব নেই বললেই চলে।
আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন, স্বাভাবিক প্রসবকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে উপস্থাপন করায় গর্ভধারিণী মায়েদের মধ্যে অযৌক্তিক ভয় তৈরি হয়।