
লিওনেল মেসি, এক জনাকীর্ণ গ্যালারির মাঝে সবচেয়ে নিভৃতচারী শিল্পী। যার পায়ের কারিকুরিতে সময় থমকে দাঁড়ায়। যিনি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন হয়েও নিজের জগতটাকে রেখেছেন অতি সংকুচিত ও শান্ত। শিখিয়েছেন কীভাবে সাফল্যের শীর্ষে থেকেও বিনয়ী থাকা যায়। মাঠের প্রবল প্রতাপের আড়ালে তার সাধারণ জীবনটা ছিল সবার অজানা।
অবশেষে সেই রহস্যের পর্দা সরিয়ে আর্জেন্টাইন জাদুকর নিজেই উন্মুক্ত করলেন তার ব্যক্তিগত জগতের জানালা। লুজু টিভিকে দেওয়া এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে নিজের মানসিকতা, অভ্যাস, পরিবার, এমনকি থেরাপি নেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেছেন মেসি। বলেছেন, ‘আমি আসলে একটু অদ্ভুত, বরং বললে ভালো, একটু বেশিই অদ্ভুত। আমার একা থাকতে খুব ভালো লাগে। নিঃসঙ্গ সময়টা আমি উপভোগ করি।’
মেসির এই স্বীকারোক্তি যেমন খোলামেলা, তেমনি সৎ। তিনি বলেন, ‘বাড়িতে তিন ছেলেকে নিয়ে সবসময় একটা বিশৃঙ্খলা থাকে। ওরা দৌড়ঝাঁপ করে, হইচই করে, মাঝে মাঝে সেটা আমার মাথার ওপর উঠে যায়। তখন একটু নিঃশব্দ সময় চাই, একটু নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে।’ ফুটবলের বাইরের জীবন নিয়েও মেসির ভাবনা ছিল সরল। খ্যাতি বা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া তার পছন্দ নয়, বরং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া তাকে বেশি টানে।
তার স্বীকারোক্তি, ‘বাড়িতে ঢোকার পর আমি একজন সাধারণ মানুষ। একজন স্বামী, একজন বাবা হিসেবে আমার দায়িত্ব আছে। সন্তানদের শাসন করি, সময় দিই, খেলি, হাসি। সবই করি। বাইরে যতই মানুষ আমাকে ভিন্নভাবে দেখুক, ঘরে আমি একদম সাধারণ।’
নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও মুখ খুলেছেন মেসি। জানিয়েছেন, বার্সেলোনায় খেলার সময় তিনি নিয়মিত থেরাপি নিয়েছিলেন। তবে এখন কাতার বিশ্বকাপজয়ীর থেরাপির প্রয়োজন হয় না। তিনি জানিয়েছেন, ‘এখন থেরাপি নেই না। কিন্তু তখন নিতাম। সবকিছু নিজের ভেতরে রাখতাম। সমস্যা গোপন করতাম। এখন অনেকটা বদলেছি। তবে সেই প্রবণতা এখনো আছে।’ তার নিজের কথায়, তিনি ভীষণভাবে ‘স্ট্রাকচার্ড’। কোনো পরিকল্পনা হঠাৎ বদলে গেলে সেটা সামলাতে তার কষ্ট হয়। মেসি জানালেন, ‘যদি দিনটা একটা নির্দিষ্টভাবে সাজানো থাকে, আর হঠাৎ মাঝপথে কিছু বদলে যায়, তখন সেটা আমাকে ভীষণভাবে অস্থির করে।’ এই গঠনমূলক মানসিকতাই হয়তো তার মাঠের শৃঙ্খলা আর পরিপূর্ণতার প্রতি একাগ্রতার মূল রহস্য।
আন্তোনেলা রোকুজ্জো, যিনি মেসির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মেসির ভাষায়, ‘আমার কী কী জিনিস অদ্ভুত, সেটা আমি বলব না। সেটা ও-ই (রোকুজ্জো) ভালো বলতে পারবে। অনেক ছোটখাটো বিষয়, অনেক সময় তুচ্ছ ব্যাপারও আমার মুডে প্রভাব ফেলে।’ এই সরল স্বীকারোক্তিতে ফুটে ওঠে এক দুনিয়া-জোড়া তারকার ঘরোয়া জীবনের মানবিক রূপ। মেসি জানিয়েছেন, মাঠের বাইরে তিনি নিজের প্রতি কঠোর। বলেন, ‘মাঝে মাঝে নিজের ওপরই রাগ করি। খারাপ খেললে, সহজ গোল মিস করলে নিজেকেই গালি দেই। মাথার ভেতরেই নিজেকে অনেক কিছু বলি। আমি জানি, আমি অনেক কিছু অর্জন করেছি। কিন্তু নিজেকে কখনো ছাড় দেই না।’
এই সাক্ষাৎকারে নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছেন মেসি। ৩৮ বছর বয়সি এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি জানালেন, কোচ হিসেবে নয়, বরং ক্লাব মালিক হিসেবে ভবিষ্যতে নিজেকে দেখতে চান। জানালেন, ‘সত্যি বলতে, কোচ হিসেবে নিজেকে ভাবতে পারি না। তবে মালিক হওয়ার ধারণাটা আমার ভালো লাগে। আমি নিজের একটা ক্লাব তৈরি করতে চাই। নিচ থেকে শুরু করে তরুণদের সুযোগ দিতে চাই। তাদের বড় হতে সাহায্য করতে চাই।’ এটা শুধু স্বপ্ন নয়, কাজও শুরু হয়ে গেছে। গত মে মাসে উরুগুয়ের নিম্ন-ডিভিশনের ক্লাব ‘ডেপোর্তিভো এলএসএম’-এর অংশীদার হয়েছেন মেসি। যেখানে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু লুইস সুয়ারেজও যুক্ত আছেন। এছাড়া আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশে ‘লিওনেস দে রোসারিও এফসি’ নামে একটি ক্লাব পরিচালনা করছে মেসির পরিবার। যারা বর্তমানে প্রিমেরা সি লিগে খেলছে।
খেলোয়াড় থেকে মালিকানা পর্যন্ত এই যাত্রা যেন মেসির স্বভাবসিদ্ধ সংযমেরই প্রতিফলন। মাঠে যেমন তিনি নিজের ছন্দে বিশ্বকে মুগ্ধ করেন, মাঠের বাইরেও তেমনি পরিমিত স্বরে নিজের পথ খুঁজে নিচ্ছেন। এতসব গম্ভীর আলাপের মধ্যে হালকা মেজাজে নিজের এক মজার দিক প্রকাশ করেছেন মেসি। তিনি বলেন, ‘আমি নাচি না, তবে একটু মাতাল হলে নাচি!’ তার পছন্দের পানীয়? ‘ওয়াইন। মাঝে মাঝে স্প্রাইট মিশিয়ে খাই। ওটা মিশালে একটু তাড়াতাড়ি লাগে,’ হাসতে হাসতে বলেন মেসি। এমন সোজাসাপ্টা, নির্ভেজাল কথায় আবারও নিজেকে প্রমাণ করলেন মেসি। খ্যাতির ভারে নয়, বরং সরলতায় তিনি আজও অনন্য। হয়তো সেটিই তাকে ‘একটু বেশিই অদ্ভুত’ করে তুলেছে। অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিক, স্বাভাবিকভাবে কিংবদন্তি।